মেজর ডালিম বাংলাদেশের ইতিহাসের না বলা সত্যকে জানুন

 

 

 
 
..ডালিম বলছি
..যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি
..জীবন বৃত্তান্ত
..সমসাময়িক ভাবনা
..প্রকাশিত বইসমগ্র
..কিছু কথা কিছু ব্যাথা
..ইংরেজী ভার্সন    
 
ধামাই অপারেশন
 
   
 

কুলাউড়া এবং বড়লেখার মধ্যে অবস্থিত জুড়ি ভ্যালি। পাথারিয়া হিলস এর গা ছুঁয়ে জুড়ি ভ্যালি। সমস্ত ভ্যালিটাই ছোট-বড় টিলায় ভরা। টিলাগুলো ছেয়ে আছে সবুজ চা বাগানে। অনেকগুলো চা বাগানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা জুড়ি ভ্যালি একটি সমৃদ্ধশালী জনপদ। চা বাগানগুলোর মধ্যে ধামাই টি ষ্টেটটাই সবচেয়ে বড়। জুড়ি ভ্যালির মধ্যমণি ধামাই টি ষ্টেট। এই ষ্টেটে রয়েছে বড় আকারের একটি টি প্রসেসিং ফ্যাক্টরি। আশেপাশের চা বাগানের চাও প্রক্রিয়াজাত করা হয় এই ফ্যাক্টরিতেই। সিদ্ধান্ত নেয়া হল এটাকে ধ্বংস করতে হবে। কাজটি সহজ নয় মোটেও। গুরুত্বপূর্ণ এই ফ্যাক্টরিকে কার্যকর রাখার জন্য কড়া পাহারার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। জুড়ি বাজারে স্থাপন করা হয়েছে খানসেনাদের ক্যাম্প। সেখান থেকে পাক বাহিনী সার্বক্ষণিক দৃষ্টি রাখছে ধামাই গার্ডেনের ফ্যাক্টরি এবং লাঠিটিলা বিওপি-র উপর। ফ্যাক্টরিটাকে ঘিরে থাকে প্রায় ৩০/৪০জন রাজাকারের একটি সশস্ত্র প্লাটুন। যেকোন অবস্থায় এই প্লাটুনকে সাহায্য করার জন্য সদা প্রস্তুত খানসেনারা। ফ্যাক্টরি ধ্বংস করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে গেরিলা কমান্ডার ফারুক, আতিক এবং মাসুক। ফারুক ও মাসুক জুড়ি ভ্যালির ছেলে। সমস্ত এলাকাটাই তাদের নখদর্পণে। আতিক বিয়ানী বাজারের ছেলে হলেও জুড়ি এলাকা সম্পর্কে তার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। তাছাড়া আতিক একজন অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ এক্সপ্লোসিভ এক্সপার্ট। বেশ কিছুদিন যাবৎ গুপ্তচরদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সব তথ্যই সংগ্রহ করা হয়েছে। ঠিক করা হয়েছে শনিবার রাতে অপারেশন চালানো হবে। কারণ, শনিবার রাত ক্লাব নাইট। সমস্ত অফিসাররা তাদের স্ত্রী ও বান্ধবীদের নিয়ে সে রাতে ক্লাবে পানাহার ও আনন্দফুর্তিতে মেতে থাকবে। তাদের সাথে যোগ দিবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসারবৃন্দ। পরদিন ছুটি। ফ্যাক্টরি থাকবে বন্ধ। তাই নিরাপত্তায় নিয়োজিত পাহারাদারদের মধ্যে কিছুটা শিথিলতা থাকাটাই স্বাভাবিক।

জুড়ি বাজার থেকে প্রায় ১১/২ কিলোমিটার দূরে একটি টিলার উপর ফ্যাক্টরি। চারিদিকে দেয়াল ঘেরা। একটি মাত্র গেইট। সেখানে রয়েছে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র প্রহরী। গেটের ভিতর ফ্যাক্টরীর উঠোনে তাবু গেড়ে প্রহরীদের স্থায়ী থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাত দশটার মধ্যেই গার্ডেনের জেনারেটর বন্ধ করে দেয়া হয়। বৈদ্যুতিক আলো নিভে যাবার পর পুরো ভ্যালিটাই অন্ধকার হয়ে যায়। শনিবার রাতেই শুধু ব্যতিক্রম। সে রাতে জেনারেটর অন থাকে মাঝরাত এমনকি শেষরাত পর্যন্ত। তবে গার্ডেনের অন্যান্য জায়গায় বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে শুধুমাত্র ক্লাবটাকেই আলোকিত করে রাখা হয় সে রাতে যতক্ষণ পর্যন্ত ক্লাব নাইট শেষ না হয়।

মেশিন ঘরটাকে চারিদিকে ঘিরে রয়েছে চা বাগান। ঠিক হলো আতিক ও ফারুক পরিচালনা করবে মূল অপারেশন। অপরদিকে মাসুকের নেতৃত্বে গেরিলাদের একটি দল আচমকা অভিযান চালাবে ক্লাবের উপর। এতে করে কর্তাব্যক্তিদের সবাই ক্লাববে মুক্তি বাহিনীর হাত থেকে বাচাঁতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। ডেকে পাঠাবে খানসেনাদের বাজার থেকে। এভাবে সবাই যখন ক্লাব ও তাদের জীবন বাচাঁতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে তখন ফারুক ও আতিক চালাবে তাদের মূল অভিযান। রাত ৯টায় ওরা সবাই যার যার লক্ষ্যস্থলে পৌছে গেল। রাত বারোটায় অপারেশন শুরু হবে। আমরা সবাই কুকিতল ক্যাম্পে অধীর আগ্রহে বারুদ ফাটার শব্দের প্রতিক্ষায় বসে থাকলাম। আমাদের ক্যাম্প থেকে প্রায় মাইল তিনেক দূরত্বে ফ্যাক্টরি। সেখানে বিষ্ফোরণ ঘটলে সেটা সহজেই শুনতে পাব। গোলাগুলির আওয়াজও শুনতে পাব পরিষ্কার। রাত বারোটা বাজার বেশ আগেই ফারুক ও আতিক তাদের দল নিয়ে ফ্যাক্টরির গেটের কাছে পৌছে গেল। গেটের অল্প দূরে চা ঝোপের ভেতর অবস্থান নিল তারা। গেটে পাহারা দিচ্ছে একজন সেন্ট্রি। সেন্ট্রিকে নিঃশব্দে খতম করতে হবে কমান্ডো কায়দায়। আতিককে সঙ্গে নিয়ে ফারুক অতি সর্ন্তপণে হামাগুড়ি দিয়ে সরে গিয়ে অবস্থান নিল প্রাচীরের একপ্রান্তে। বাকি সবাই নিঃস্তব্দ হয়ে বসে থাকল চা ঝোপের ভিতরে। প্রাচীরের প্রান্তে পৌছে ফারুক আতিককে নিচু গলায় বলল, “তুই আমাকে কভার কর; আমি যাচ্ছি সেন্ট্রিকে খতম করার জন্য।” আতিক তার ষ্টেনগান নিয়ে তৈরি হল। ফারুক তার ষ্টেনগানটাকে পিঠের উপর ফেলে ধারালো কমান্ডো ড্যাগারটা হাতে নিয়ে শিকারী বেড়ালের মত নিঃশব্দে ক্রলিং করে এগিয়ে চলল দেয়ালের গা ঘেষে। আতিক তীক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে অবলোকন করতে থাকল সেন্ট্রির গতিবিধি। ফারুক ক্রলিং করছে কিছুদুর আর থামছে। এভাবে সে পৌছে গেল সেন্ট্রিটার কাছে। সেন্ট্রি কিছুই টের পেল না। ফারুকের কাছ থেকে সেন্ট্রির অবস্থান মাত্র চার-পাচঁ হাত। হঠাৎ আচমকা উঠে পেছন থেকে ফারুক একহাতে চেপে ধরল সেন্ট্রির গলা আর আরেক হাতে ঢুকিয়ে দিল কমান্ডো ড্যাগারটা তার পেটে। মৃত্যু যন্ত্রনায় অস্পষ্টভাবে আর্তনাদ করে উঠল সেন্ট্রি কিন্তু ফারুকের শক্ত হাতের নিষ্পেষণে তার গলা থেকে কোন শব্দ বেরুল না। ফারুক নিঃশব্দে তাকে টেনে নামিয়ে আনলো একটা চা ঝোপের মধ্যে। আতিক ততক্ষণে দলের অন্যান্যদের নিয়ে এসেছে ফারুকের জায়গায়। ফারুকের পাশেই পড়ে আছে সেন্ট্রির নিথর দেহ। ভেতরের পাহারাদারদের কেউই কিছু আচঁ করতে পারল না। এরপর অতি সহজেই ওরা ঢুকে পড়ল ফ্যাক্টরিতে। তাবুতে ঘুমন্ত অবস্থায় বাকি রাজাকারদের নিরস্ত্র করতে তাদের কোন বেগ পেতে হল না। তাদের নিরস্ত্র করে ওরা তড়িৎ গতিতে বারুদ লাগাতে লাগল মেশিন ঘরে আতিকের নির্দেশনায়। হঠাৎ রাতের নিঃস্তব্দতা ভেদ করে শোনা গেল ফায়ারিং এর আওয়াজ। ওরা বুঝতে পারল এ ফায়ারিং করছে মাসুকের দল। অল্পক্ষণের মধ্যেই চার্জ লাগানোর কাজ শেষ হল। আতিক সবকিছুর তদারক করে press করল ডেটোনেটর। বিষ্ফোরণের বিকট শব্দে কেপেঁ উঠল পুরো ভ্যালিটা। আর একই সাথে একটা আগুনের কুন্ডলী হয়ে উড়ে গেল ধামাই ফ্যাক্টরি। পুরো মেশিনঘরটা ভেঙ্গে গুড়িয়ে পরিণত হল কংক্রীট ও লোহা-লক্করের একটা আবর্জনা স্তুপে। আমরা শুনতে পেলাম বিষ্ফোরণের প্রচন্ড শব্দ। বুঝলাম অপারেশন সফল হয়েছে। বিষ্ফোরণের কিছুক্ষণ পর ক্লাবের দিক থেকে ফায়ারিং এর আওয়াজও থেমে গেল। ভোর পাচঁটার দিকে ওরা সবাই ফিরে এল ক্যাম্পে বিজয়ী হয়ে। পূবের আকাশে ঊষার আলোকে তখন রাঙ্গা হয়ে উঠেছে।

’৭১ এর জানবাজ দামাল মুক্তিযোদ্ধারা আজ অসহায়, নিঃস্তেজ, দুর্বল। নেতিবাচক হতাশার আবর্তে নিষ্পেষিত, জীবনযুদ্ধে পরাজিত, রাজনৈতিক চক্রান্তের শিকারে পরিণত হয়ে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে জাতীয় মুক্তি ও দেশ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অগ্রণীর ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। এ ব্যর্থতার দায়মুক্ত হবার জন্য সমস্ত চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে জনগণের মুক্তি সংগ্রামে ’৭১ এর চেতনায় আবার তাদের এগিয়ে আসতে হবে অগ্রণীর ভূমিকায়। ১৪ কোটি দেশবাসীকে দেখাতে হবে মুক্তির পথ, সত্যের পথ, সাম্যের পথ। জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি নেতিবাচক চিন্তা-চেতনার উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণার রাহুগ্রাস থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে আবার তাদের ইতিবাচক ভূমিকা রাখার অঙ্গিকারের শপথ নিতে হবে। এ দায়িত্ব গ্রহণের ব্যর্থতা দেশ ও জাতির অস্তিত্বকে করে তুলবে বিপন্ন। ভবিষ্যত হয়ে উঠবে অনিশ্চিত।