মেজর ডালিম বাংলাদেশের ইতিহাসের না বলা সত্যকে জানুন

 

 

 
 
..ডালিম বলছি
..যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি
..জীবন বৃত্তান্ত
..সমসাময়িক ভাবনা
..প্রকাশিত বইসমগ্র
..কিছু কথা কিছু ব্যাথা
..ইংরেজী ভার্সন    
 
কমরেডশীপ
 
   
 

আসামের জকিগঞ্জ থেকে প্রায় ধর্মতলা পর্যন্ত বিস্তৃত চার নম্বর সেক্টর। ভারত-পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত জুড়ে পাথারিয়া হিলস এর কোল ঘেষে দুই দিকেই শুধু চা বাগান। চড়াই উৎরাই পেড়িয়ে শুধু ঘন বন আর সবুজের সমারোহ। জুন মাসের শেষাশেষি সিদ্ধান্ত গৃহিত হল বাংলাদেশের চা বাগানগুলোর উৎপাদন বন্ধ করে দেবার জন্য ফ্যাক্টরিগুলো ধ্বংস করে দেয়া হবে।

কলকলিঘাট বিএসএফ ক্যাম্প ছাড়িয়ে পাথারিয়া হিলসের গভীর জঙ্গলে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের একটা ক্যাম্প। সে ক্যাম্প থেকে দিলকুশা গার্ডেনের মেশিনঘর উড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। আমি এই গেরিলা অপারেশনের প্ল্যানিং পর্যবেক্ষণ করার জন্য সেখানে এসে উপস্থিত হলাম। ঠিক হলো সেকশন ষ্ট্রেনে'র চারটি গ্রুপ নিয়ে একটি শক্তিশালী দল পাঠানো হবে এই দুরুহ কাজ সম্পন্ন করার জন্য। সর্বমোট ৪৫জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল। একটি প্রটেকশন পার্টি, দুটো মেইন Assault গ্রুপ এবং একটি এক্সপ্লোসিভ গ্রুপ। বাবু, আতিক, ফারুক এবং মাহবুবকে নিযুক্ত করা হলো গ্রুপ কমান্ডার হিসেবে। ঠিক করলাম আমিও যাব তাদের সাথে। সীমান্ত থেকে প্রায় মাইল পাচেঁক ভিতরে অবস্থিত টার্গেট। রাত ১০টায় RV থেকে রওয়ানা হয়ে ভোর তিনটায় টার্গেট-এ রেইড করা হবে। এক ঘন্টার মধ্যে মেশিনঘর উড়িয়ে দিয়ে ৪টার মধ্যে ফিরে আসতে হবে। দিলকুশা, বরলেখা ও জুড়িতে পাকিস্তান আর্মির শক্তিশালী ঘাটি রয়েছে। আচমকা হামলা চালিয়ে অপারেশন শেষ করে অতি দ্রুততার সাথে withdraw করে ফিরতে না পারলে encircled হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। ভিষণ বিপদজনক মিশন।

রাত ঠিক ১০টায় গাইড নিয়ে পাহাড়ী জঙ্গলের পায়ে চলার চোরা পথে রওয়ানা হলাম। সাধারণ রাস্তা দিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। সবগুলো পথই মাইন্‌ড; বিপদসংকুল। অতি সর্ন্তপণে নাইটমার্চ শুরু হল। কোন বিভ্রাট ছাড়াই নিঝুম রাতে ঝিঁ ঝিঁ পোকার একটানা গান শুনতে শুনতে জোনাকির আলোয় নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছি আমরা। ঘনঘোর অন্ধকার। গভীর জঙ্গলে মাঝেমধ্যে নিশাচর জন্তুর চলাফেরার আওয়াজ কখনো কখনো শুনতে পাচ্ছিলাম। কোথাও পাহাড়ী ঝরণার কুলকুল ধ্বনি। এই পাহাড়ী এলাকায় বিচক্ষণ গাইড ছাড়া এক পা নড়ারও জো নেই। আমাদের গাইড হিসেবে থাকতো অভিজ্ঞ চোরাকারবারীরা। সমস্ত চোরা পাহাড়ী পথঘাট তাদের নখদর্পণে। শামছু মিঞা তেমনই একজন চোরাচালানকারি। সংগ্রামে যোগ দিয়েছে দেশকে খানসেনাদের হাত থেকে  আজাদ করার জন্য। তার বদৌলতে আমরা বেশ ক’জন অভিজ্ঞ গাইড পেয়েছিলাম। আজ শামছু মিঞা চলেছে আমার সাথে। হক ভাই স্বয়ং যাবেন তাই পথ দেখাবার দায়িত্ব সে অন্য কাউকে দিতে নারাজ। সে যাবে স্বয়ং নিজে।

শামছু মিঞা কখনোই আমাকে একা ছাড়েনি। ওর উপস্থিত বুদ্ধি ও এলাকা সম্পর্কে বিশদ জ্ঞানের জন্য আমরা অনেক সফল অভিযান করতে পেরেছি। নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকেও বেচেঁ গিয়েছি শামছু মিঞার অভিজ্ঞতার জন্য কয়েকবার। আমাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতো এবং ভালবাসতো শামছু মিঞা। প্রতিটি অপারেশনে যেখানেই আমি গিয়েছি শামছু মিঞা আমাকে বুক দিয়ে ছায়ার মত ঘিরে থেকেছে। তার কথা হল যদি কিছু হয় সেটা তার হউক। আমার কিছু হলে সেটা সে সহ্য করতে পারবে না। পারবে না সে নিজেকে ক্ষমা করতে। আমার প্রতি তার এই অদ্ভুত মমতা ও আন্তরিক শ্রদ্ধার কথা ভোলা যাবে না কোনদিন। সময়মত টার্গেটের কাছে RV -তে পৌছে গেলাম আমরা। কারখানাটা পাক আর্মির একটি প্লাটুন পাহারা দিচ্ছে। কভারিং গ্রুপের ছত্রছায়ায় Assault গ্রুপ দু’টোর বিচ্ছুরা নিঃশব্দে এগিয়ে গেল টার্গেট কব্জা করতে। গেটে দু’জন প্রহরী। তাদের নিরস্ত্র করে চার্জ করা হল টার্গেট। কয়েক মিনিট গোলাগুলির পর পুরো প্লাটুন আত্মসমর্পণ করল আমাদের Assault গ্রুপের কাছে। তাদের নিরস্ত্র করে বন্দি করা হল। ডেমোলিশন গ্রুপ ক্ষীপ্র গতিতে শুরু করল চার্জ ও এক্সপ্লোসিভ বসাবার কাজ। কয়েক মিনিট পর চার্জ ডেটোনেট করা হল। কান ফাটানো আওয়াজের সাথে সাথে পুরো মেশিনঘর একটা ধুঁয়া ও আগুনের কুন্ডলী হয়ে উঠে গেল আকাশে। ক্ষণিকের জন্য সমস্ত বাগানটাই আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তারপরই নেমে এল অন্ধকার।

বাগান রেইড করা হয়েছে বুঝতে পারল দিলকুশা, বরলেখা ও জুড়িতে অবস্থিত খানসেনারা। সবদিক থেকেই শুরু হল গোলাবর্ষণ। মর্টার আর ভারী মেশিনগানের অজস্র গোলা এসে দিলকুশা গার্ডেনের চা গাছের ঝোপগুলো সমূলে উপড়ে ফেলছিল। উপত্যাকার ধান ক্ষেতেও এসে পড়ছিল গোলাগুলো। হঠাৎ করে ক্রসফায়ারে পড়ে আমরা বেশ বেকায়দায় পড়েছি। withdraw করার রাস্তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল শত্রুপক্ষের অবিরাম গোলাবর্ষণে। আমরা একটা টিলার গা ঘেষে কোনরকমে কভার নিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছিলাম। সঙ্গে রয়েছে প্রায় ৮/১০ জন বন্দি।

হঠাৎ করে আমাদের প্রটেকশন পার্টির একটা ছেলে বাবুলের ডান পায়ে মেশিনগানের গুলি লেগে হাটুর নিচ থেকে ডান পা’টা প্রায় দু’টুকরা হয়ে গেল। অত্যন্ত সাহসী আর নির্ভীক এই বাবুল। যেকোন বিপদে আদেশ পাওয়া মাত্র ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেছি। পায়ে গুলি লাগায় সে নিজেকে ভিষণ অসহায় মনে করছিল। আমরা তাকে ধরাধরি করে কিছুটা নিরাপদ জায়গায় শুইয়ে দিয়ে আমি বললাম, “তুমি ভেবো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”

এ জায়গা থেকে অবিলম্বে আমাদের গোলাগুলির বৃষ্টির মধ্যে দিয়েই বেরিয়ে যেতে হবে। তা না হলে সবাইকে মরতে হবে নতুবা বন্দি হতে হবে খানসেনাদের হাতে। সময়ও বয়ে চলেছে অতি দ্রুত। সকাল হওয়ার আগেই পাথারিয়া হিলস এর জঙ্গলে গিয়ে পৌছাতে হবে আমাদের। কিন্তু বাবুলকে নিয়ে কি করা যায়? তাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া দুরুহ কাজ। কিন্তু বাবুলকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখেই বা যাই কি করে! বিবেক কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না। ঠিক করলাম যেভাবেই হোক বাবুলকে বহন করে সাথে নিয়ে যাব। একটা গামছা দিয়ে ভাঙ্গা পা’টা দু’টো কাঠি দিয়ে কোনমতে বাধঁলাম। চারটা রাইফেল ও স্লিং দিয়ে একটা স্ট্রেচার বানানো হল। এক বাবুলের জন্য সবার জীবন বিপন্ন করা ঠিক হবে না। তাই ঠিক করলাম মাত্র ৮জনকে রেখে বাকি সবাইকে চলে যেতে বলব। কারণ বাবুলকে কাধেঁ নিয়ে অতি সতর্কতার সাথে আস্তে আস্তে চলতে হবে আমাদের। সবাইকে জড়ো করে বললাম, “বাবুলকে কাধেঁ বয়ে নিয়ে যাবার জন্য ৮জন ভলান্টিয়ার চাই।” সবাই বুঝতে পারল এ দায়িত্ব গ্রহণ করলে বিশেষ ঝুঁকি নিতে হবে। তাই সবাই কিছুটা ইতঃস্তত করছিল স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসতে। কিন্তু বাবুলকে সঙ্গে নিয়ে যাবই। আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বললাম, “তোমাদের মধ্যে ভলান্টিয়ার না পাওয়া গেলে আমি একাই বাবুলকে কাধেঁ বয়ে নিয়ে যাব।” আমার কথায় কি প্রতিক্রিয়া হল জানি না; দেখলাম সবাই ভলান্টিয়ার হতে চায়। তাদের মধ্য থেকে ৮জনকে রেখে বাকিদের চলে যাবার আদেশ দিলাম। বললাম, “বেঁচে থাকলে পাথারিয়ার জঙ্গলের RV-তে আমরা বাবুলকে নিয়ে পৌছাব। চার ঘন্টার মধ্যে আমরা যদি না পৌছাতে পারি তবে তোমরা সবাই বেইস ক্যাম্পে চলে যাবে।” স্বাভাবিক অবস্থায় RV-তে পৌছাতে ঘন্টা দু’য়েক লাগার কথা। বাবু, আতিক, মাহবুব, ফারুক ওরা কিছুতেই আমাদের রেখে যেতে চাচ্ছিল না। তারা বুঝতে পেরেছিল আমি নিজে না থাকলে দলের অন্যরা বাবুলকে বহন করে নেবার ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব নিতে ইতঃস্তত করত; তাই আমি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আমার নির্দেশে ওরা চলে গেল বাধ্য হয়ে নিজেদের অনিচ্ছাসত্ত্বেও। রয়ে গেলাম আমি, শামছু মিঞা, বাবুল আর ৮জন মুক্তিযোদ্ধা।

বাবুলকে কাধেঁ তুলে নিয়ে আস্তে আস্তে চলা শুরু করলাম আমরা। দুর্গম পাহাড়ী রাস্তার চড়াই উৎরাই পেরিয়ে কাউকে কাধেঁ বহন করে নিয়ে যাওয়া সত্যি ভিষণ কষ্টকর। কিন্তু একজন সহযোদ্ধার জীবন বাচাঁতে সব কষ্টকে হাসিমুখে বরণ করে অতি সতর্কতার সাথে বন্ধুর ও বিপদজনক পথ পাড়ি দিয়ে আমরা চার ঘন্টার আগেই পৌছাতে পেরেছিলাম পাথারিয়া হিলস এর  জঙ্গলের RV-তে। আমাদের ফিরে পেয়ে বাকি অপেক্ষারত সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে আমাদের জড়িয়ে ধরল। সেখানে পাহাড়ী এক হাতুড়ে ডাক্তারের সাহায্যে বাবুলের ফার্ষ্ট এইড এর ব্যবস্থার পর স্ট্রেচারে করে তাকে বয়ে নিয়ে বন্দিদের সাথে করে ফিরে এসেছিলাম বেইস ক্যাম্পে।

সমূহ বিপদের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাবুলকে কাধেঁ করে বয়ে আনার সিদ্ধান্ত একটা শিক্ষামূলক দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রচারিত হয়ে গিয়েছিল বিভিন্ন সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে। আমার অধীনস্ত ক্যাম্পগুলোর মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে সেই দৃষ্টান্ত এক অভূতপূর্ব প্রভাব ফেলেছিল। একের উপর অপরের নির্ভরশীলতা ও বিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল অনেক। এরপর মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত আমার অধীনস্ত কোন মুক্তিযোদ্ধাকে কখনোই আহত অবস্থায় শত্রুর কবলে অসহায় অবস্থায় ফেলে আসা হয়নি। এমনকি মৃত মুক্তিযোদ্ধাদের লাশও উদ্ধার করে নিয়ে আসার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা হয়েছে সর্বক্ষেত্রে।